↩ নিউজ
প্রিন্ট এর তারিখঃ ১৪ জুন ২০২৬, ২:২৪ এ.এম || প্রকাশের তারিখঃ ১৩ জুন ২০২৬, ৭:০২ পি.এম

কম্বোডিয়ার সাইবার স্ক্যাম সেন্টার থেকে উদ্ধার আরও ৫৪ বাংলাদেশি দেশে ফিরলেন

✍️ প্রতিবেদক: দীপ্ত বাংলাদেশ নিউজ ডেস্ক

কম্বোডিয়ার বিভিন্ন সাইবার স্ক্যাম কম্পাউন্ড থেকে উদ্ধার হওয়া আরও ৫৪ জন বাংলাদেশি নাগরিক দেশে ফিরেছেন। আজ শনিবার (১৩ জুন) দুপুরে থাই এয়ারওয়েজের একটি বিশেষ ফ্লাইটে এই ৫৪ জন হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান।

এর আগে গতকাল আরও ৩৭ জন বাংলাদেশি একইভাবে দেশে ফিরেছিলেন। এ নিয়ে গত দুই দিনে কম্বোডিয়া থেকে মোট ৯১ জন বাংলাদেশি নাগরিক স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করলেন। আজ ফেরত আসা সবাইকে বিমানবন্দরে জরুরি প্রাথমিক সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি নিরাপদে বাড়িতে পৌঁছানোর জন্য অর্থ সহায়তা করেছে ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম।

জানা গেছে, বিদেশে ভালো চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) বৈধ ছাড়পত্র দিয়েই তাদের সবাইকে কম্বোডিয়ায় পাঠানো হয়েছিল। তবে সেখানে পৌঁছানোর পর বাংলাদেশি দালাল চক্রের মাধ্যমে তাদেরকে মোটা অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে চীনা নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন সাইবার স্কাম কম্পাউন্ডে হস্তান্তর বা বিক্রি করা হয়।

আজ ফেরত আসা এক ভুক্তভোগী তাঁর ভয়াবহ অভিজ্ঞতার বিবরণ দিয়ে জানান, জনশক্তি ব্যুরোর ছাড়পত্র নিয়ে ২০২৫ সালের ৫ ডিসেম্বর তাঁর ফ্লাইট হয়। ২ দিন মালয়েশিয়ায় ট্রানজিটে থাকার পর ৭ ডিসেম্বর তিনি কম্বোডিয়া এয়ারপোর্টে পৌঁছান। বিমানবন্দরের বাইরে আসার পর রবিন শেখ নামের এক বাংলাদেশি দালাল তাকে রিসিভ করে নিজের বাসায় নিয়ে যান। সেখানে কিছুদিন রাখার পর ২৩ ডিসেম্বর কম্পিউটারের কাজের কথা বলে তাকে একটি কোম্পানিতে নিয়ে যাওয়া হয়। পরের দিন কাজে যোগ দিয়ে তিনি বুঝতে পারেন এটি একটি স্ক্যাম প্ল্যাটফর্ম, যেখানে মানুষের সঙ্গে অনলাইনে প্রতারণা করে টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়।

তিনি আরও জানান, প্রতারণামূলক কাজ করতে অস্বীকৃতি জানালে ওখানকার চাইনিজ বস টাকা দিয়ে পাসপোর্ট নিয়ে চলে যেতে বলেন। এ সময় তিনি জানতে পারেন, দালাল রবিন শেখ ২০৮৫ ডলারে তাকে ওই স্ক্যাম সেন্টারে বিক্রি করে দিয়েছে। এই টাকা পরিশোধ করতে না পারলে অস্ত্রের মুখে বাধ্য হয়ে কাজ করতে হতো।

আরেকজন ভুক্তভোগী জানান, কম্বোডিয়ায় অবস্থানরত এক বাংলাদেশি দালাল সেখানকার স্থানীয় নাগরিককে বিয়ে করে দীর্ঘ সময় ধরে সেখানে বসবাস করছেন। তিনি প্রথমে তাকে একটি সুপারশপে চাকরির কথা বলে নিয়ে ৫ মাস কাজ করান। কিন্তু প্রতিমাসে মাত্র ৪০০ ডলার বেতন দেওয়ায় থাকা-খাওয়ার পর তাঁর কাছে কিছুই থাকত না। পরবর্তীতে তিনি ও তাঁর পরিবার বেতনের জন্য চাপ দিলে একদিন অন্য কোম্পানিতে ভালো চাকরির নাম করে তাকে ওই স্ক্যাম সেন্টারে বিক্রি করে দেওয়া হয়।

ভুক্তভোগীরা জানান, এসব সুরক্ষিত কম্পাউন্ডে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোরপূর্বক অনলাইন প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হতে বাধ্য করা হতো। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন উন্নত দেশের নাগরিকদের লক্ষ্য করে পরিচালিত সাইবার স্কাম কার্যক্রমে অংশ নিতে তাদের ওপর চরম চাপ প্রয়োগ করা হতো। নির্ধারিত লক্ষ্য বা টার্গেট পূরণে ব্যর্থ হলে তাদের ওপর অমানুষিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হতো।

অনুরূপভাবে, এ বছরের ২২ জানুয়ারি মিয়ানমারের একটি সাইবার স্ক্যাম সেন্টার থেকে আট জন এবং ২০২৫ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর ১৮ জন বাংলাদেশি নাগরিক দেশে ফেরেন। তাদেরও ভালো কাজের প্রলোভন দেখিয়ে থাইল্যান্ডের সীমান্ত এলাকা মায়েসট হয়ে জোরপূর্বক মিয়ানমারে প্রবেশ করানো হয়েছিল এবং পাসপোর্ট-মোবাইল কেড়ে নিয়ে নির্যাতন করা হতো।

ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরিফুল হাসান জানান, কম্বোডিয়ার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাম্প্রতিক বিশেষ অভিযানের ফলে কয়েকটি স্ক্যাম কম্পাউন্ড থেকে এসব বাংলাদেশিকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়। পরপর দুদিনে ৯১ জন বাংলাদেশির ফেরত আসা প্রমাণ করে যে বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশি এভাবে প্রতারণা ও নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, সাইবার স্ক্যাম বর্তমানে মানবপাচারের একটি অত্যন্ত ভয়াবহ আধুনিক ধরন। কম্পিউটার বা কলসেন্টার অপারেটরসহ বিভিন্ন পদে আকর্ষণীয় বেতনের প্রলোভন দিয়ে ভুয়া ওয়েবসাইট, ইমেইল, ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রামের মাধ্যমে প্রচারণা চালানো হয়। এরপর সুকৌশলে স্ক্যাম সেন্টারের ভেতরে নিয়ে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করা হয়। এই পরিস্থিতির কারণে সরকার এবং ব্র্যাকের পক্ষ থেকে থাইল্যান্ড, মিয়ানমার, লাওস, ভিয়েতনামের পাশাপাশি কম্বোডিয়ায় যাওয়ার বিষয়ে বারবার সতর্কতা জারি করা হয়েছে।