খুলনা-১ আসনে জামায়াতের রহস্যময় হিন্দু প্রার্থী: আন্তর্জাতিক যোগসূত্রের তথ্য ফাঁস, বিতর্কে রাজনৈতিক ময়দান

খুলনা-১ (দাকোপ-বটিয়াঘাটা) আসনে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে ডুমুরিয়া উপজেলা হিন্দু কমিটির সভাপতি কৃষ্ণ নন্দীকে প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করার পর দেশের রাজনীতিতে এক নজিরবিহীন চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। ধর্মীয় পরিচয়ে হিন্দু সম্প্রদায়ের এই ব্যবসায়ীকে জামায়াত কেন তাঁদের দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় স্থানীয় নেতা মাওলানা আবু ইউসুফকে হটিয়ে মনোনয়ন দিল, তা নিয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক শিবির এখন দ্বিধাবিভক্ত।
গত ৩ ডিসেম্বর জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমানের ঘোষণার পরপরই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় তীব্র আলোচনা-সমালোচনা। এর মূলে রয়েছে দুটি গুরুতর অভিযোগ: আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠতা এবং ভারতের বিশেষ সংস্থার সঙ্গে যোগসূত্র।
ব্যবসায়ী কৃষ্ণ নন্দীর রাজনৈতিক পরিচিতি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অভিযোগ উঠেছে, তিনি ছিলেন বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র চন্দের অতি ঘনিষ্ঠজন। মন্ত্রী এবং কৃষ্ণ নন্দীর বিভিন্ন কর্মসূচির ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ: চুকনগরের একাধিক ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ খোলাখুলি অভিযোগ করছেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের সময় ক্ষুব্ধ জনতা কৃষ্ণ নন্দীকে ‘আওয়ামী লীগের দোসর’ মনে করেই তাঁর ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বাসভবনে হামলা ও অগ্নিসংযোগ করেছিল। তাঁদের দাবি, চরম রাজনৈতিক সংকটে নিজেকে রক্ষা করতেই তিনি তড়িঘড়ি করে জামায়াতের ব্যানারে আশ্রয় নিয়েছেন।
কৃষ্ণ নন্দীকে ঘিরে সবচেয়ে বড় বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে ভারতের একটি হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের নেতার সঙ্গে তাঁর ছবি ফাঁস হওয়ায়। সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ওয়ার্ল্ড হিন্দু স্ট্রাগল কমিটি বাংলাদেশের সভাপতি শিপন কুমার বসুর সঙ্গে কৃষ্ণ নন্দীর একাধিক ছবি প্রকাশ করেছেন।
সাংবাদিকের তথ্য: সায়েরের পোস্ট অনুযায়ী, ছবিটি ২০১৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির। অনুসন্ধানে তিনি নিশ্চিত করেছেন যে, ওই সময় কৃষ্ণ নন্দী ভারতে অবস্থান করছিলেন এবং তাঁর ২৩ বারের ভারত গমনের রেকর্ড রয়েছে। আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, একই বৈঠকে ভারতের অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা ইনটেলিজেন্স ব্যুরোর (আইবি) একজন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন। এই ছবি ফাঁস হওয়ার পর খুলনাবাসী আশঙ্কা করছেন, কৃষ্ণ নন্দীর সঙ্গে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের বিশেষ কোনো সংস্থার নিবিড় যোগাযোগ রয়েছে। এমন স্পর্শকাতর তথ্য প্রকাশ্যে আসার পরও কেন জামায়াত তাঁকে এত প্রভাবশালী আসনে চাপিয়ে দিল, তা নিয়ে গভীর ষড়যন্ত্রের গুঞ্জন চলছে।
খুলনা-১ আসনটি সংখ্যালঘু অধ্যুষিত (প্রায় ৪৩% হিন্দু ভোটার) এবং ঐতিহাসিকভাবে আওয়ামী লীগের ‘দুর্গ’ হিসেবে পরিচিত। জামায়াত ১৯৯৬ সালের পর এখানে আর প্রার্থী দেয়নি। এবার প্রথমে জনপ্রিয় মাওলানা আবু ইউসুফকে মনোনয়ন দিয়ে চূড়ান্ত মুহূর্তে তাঁকে সরিয়ে কৃষ্ণ নন্দীর মতো বিতর্কিত ও স্থানীয়ভাবে তেমন সক্রিয় না থাকা একজনকে প্রার্থী করা জামায়াত হাইকমান্ডের এক অস্বাভাবিক রাজনৈতিক কৌশল বলে মনে করছেন মাঠ পর্যায়ের কর্মীরা।
যদিও মনোনয়ন হারানো মাওলানা আবু ইউসুফ দলের সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছেন এবং কৃষ্ণ নন্দীর পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছেন, তবুও এই অপ্রত্যাশিত প্রার্থী পরিবর্তন জামায়াতের অন্তঃমহলে অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে।