↩ নিউজ
প্রিন্ট এর তারিখঃ ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ৫:১৮ পি.এম || প্রকাশের তারিখঃ ১ জানুয়ারি ২০২৬, ৬:৫৫ পি.এম

ভার​​তীয় কূটনীতিকের সঙ্গে বৈঠক করেছেন কয়েক মাস আগে; রয়টার্স প্রতিবেদকের জিজ্ঞাসার মুখে স্বীকার করলেন এতদিন পর, কিন্তু কি এমন আলোচনা যা জামায়াত আমীর গোপন রেখেছিলেন এবং কেন!

✍️ প্রতিবেদক: দীপ্ত বাংলাদেশ নিউজ ডেস্ক

গত বছরের শুরুতে এক ভারতীয় কূটনীতিকের সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং সেই সাক্ষাতের বিষয়টি দীর্ঘ সময় গোপন রাখাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমানের রাজনৈতিক অবস্থান ও স্বচ্ছতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন আরও তীব্র হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি ঘিরে আলোচনা এখন আর কেবল “গোপন বৈঠক” শব্দবন্ধে সীমাবদ্ধ নেই—বরং প্রশ্ন উঠছে কেন গোপন রাখা হলো, কার স্বার্থে, কী বিনিময়ে, আর কেন এখন প্রকাশ্য ব্যাখ্যা?

সোশ্যাল মিডিয়া ও প্রকাশিত গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তথ্য অনুযায়ী, বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে আন্তর্জাতিক বার্তাসংস্থা রয়টার্স চলতি বছরের শুরুতে একজন ভারতীয় কূটনীতিকের সঙ্গে ডা. শফিকুর রহমানের সাক্ষাৎ হয়েছিল কি না—এ বিষয়ে তাঁকে প্রশ্ন করে। জবাবে ডা. শফিকুর রহমান সাক্ষাতের বিষয়টি স্বীকার করে রয়টার্সকে জানান, চলতি বছরের শুরুতে একজন ভারতীয় কূটনীতিক তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন এবং ওই কূটনীতিকের অনুরোধেই বিষয়টি গোপন রাখা হয়েছিল।

এখান থেকেই শুরু হয় অনুসন্ধানী ধরনের প্রশ্নগুলোর সারি—যে সাক্ষাৎকে পরে “সৌজন্য সাক্ষাৎ” বলা হচ্ছে, সেটি এতদিন প্রকাশ না করার প্রয়োজন কেন দেখা দিল? আর যদি সেটি কেবল সৌজন্য বিনিময়ই হয়, তবে “গোপন রাখার অনুরোধ” মানা হলো কেন? রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রশ্ন উঠছে, অন্যান্য দেশের কূটনীতিকদের সঙ্গে সাক্ষাৎ প্রকাশ্যে এলেও ভারতীয় কূটনীতিকের সঙ্গে সাক্ষাৎ প্রকাশ না করার সিদ্ধান্তের পেছনে কী ছিল—কূটনৈতিক সংবেদনশীলতা, রাজনৈতিক হিসাব, নাকি অন্য কোনো বিবেচনা?

রয়টার্সের প্রতিবেদন সামনে আসার পর বিভিন্ন বিশ্লেষক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, গোপনীয়তার বিষয়ে আপত্তি থাকলে ঘটনাটি ঘটার সময়ই প্রকাশ্যে আনা উচিত ছিল। কারণ “আমরা গোপনীয়তায় বিশ্বাস করি না”—এই অবস্থান পরে এসে বললে তা অনেকের কাছে ক্ষত-নিয়ন্ত্রণ (damage control) বা পরিস্থিতিগত চাপ সামাল দেওয়ার প্রচেষ্টা হিসেবে ধরা পড়ে। অনুসন্ধানী দৃষ্টিতে প্রশ্নটা দাঁড়ায়—সেই সময় প্রকাশ না করে এখন কেন? রয়টার্সে প্রশ্ন ওঠার আগ পর্যন্ত কি এ বিষয়ে অবস্থান নেওয়ার তাগিদ অনুভূত হয়নি?

এরপর (১ জানুয়ারি) বৃহস্পতিবার সকালে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে ডা. শফিকুর রহমান দাবি করেন, অসুস্থতা কাটিয়ে বাসায় ফেরার পর দেশ-বিদেশের অনেকেই তাঁর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন; ভারতীয় কূটনীতিকরাও এসেছিলেন। তিনি জানান, তিনি বিষয়টি প্রকাশ করতে চাইলেও ভারতীয় কূটনীতিকদের পক্ষ থেকে তখন তা প্রকাশ না করার অনুরোধ করা হয়। একই সঙ্গে তিনি বলেন, ভবিষ্যতে দুই দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট কোনো বৈঠক হলে তা গোপন রাখার সুযোগ নেই এবং সবকিছু প্রকাশ্যেই হবে।

কিন্তু এখানেই বিতর্ক আরও গভীর হয়। সমালোচকদের বক্তব্য, ভবিষ্যৎ স্বচ্ছতার ঘোষণায় অতীতের গোপনীয়তার ব্যাখ্যা শেষ হয়ে যায় না। বরং প্রশ্ন আরও তীক্ষ্ণ হয়—একজন রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে বিদেশি কূটনীতিক সাক্ষাৎ করলে সেটি প্রকাশ হবে কি না, সে সিদ্ধান্ত কি কেবল বিদেশি কূটনীতিকের “অনুরোধে” নির্ধারিত হবে? যদি হয়, তাহলে সার্বভৌম রাজনৈতিক স্বচ্ছতার মানদণ্ড কোথায় দাঁড়ায়? আর যদি না হয়, তবে অনুরোধ মানা হলো কেন?

অনুসন্ধানী পর্যবেক্ষণে আরেকটি কেন্দ্রীয় প্রশ্ন হলো—এই সাক্ষাতে কী আলোচনা হয়েছিল? ডা. শফিকুর রহমান ভবিষ্যতে স্বচ্ছতার কথা বললেও ইতোমধ্যে হওয়া সাক্ষাতের আলোচ্য বিষয়, আলোচনার পরিধি, কোনো নীতিগত সমঝোতা বা প্রতিশ্রুতি ছিল কি না—এসব বিষয়ে এখনো কোনো স্পষ্ট তথ্য সামনে আসেনি। ফলে জনমনে সন্দেহ তৈরি হয়েছে—এটি কি কেবল সৌজন্য সাক্ষাৎ ছিল, নাকি রাজনৈতিক বার্তা বিনিময়, নির্বাচনী প্রেক্ষাপট বা কূটনৈতিক সমীকরণ নিয়ে কোনো ধরনের আলোচনা হয়েছিল? একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে, ভারতীয় কূটনীতিক কেনই বা বিষয়টি গোপন রাখতে বললেন—এটি কি তাঁর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত, নাকি বৃহত্তর কোনো কূটনৈতিক কৌশলের অংশ?

এখানে আরও একটি দিক গুরুত্বপূর্ণ। রয়টার্সের প্রশ্নের মুখে সাক্ষাৎ স্বীকার করার পর, পরে সামাজিক মাধ্যমে “গোপন বৈঠক” প্রচারের নিন্দা—দুই অবস্থানের মধ্যে সমন্বয় নিয়ে প্রশ্ন আছে। কারণ সমালোচকদের মতে, যে তথ্য প্রকাশ না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, সেটিই তো কার্যত ‘গোপন’ অবস্থায় ছিল—এখন সেটি কীভাবে পুরোপুরি “বিভ্রান্তিকর প্রচার” হয়ে যায়? অনুসন্ধানী ভাষায় প্রশ্নটা দাঁড়ায়—গোপন রাখার সিদ্ধান্তের দায় কার? বিদেশি কূটনীতিক অনুরোধ করতে পারেন, কিন্তু রাজনৈতিক নেতার দায়িত্ব কি জনস্বার্থের জায়গায় সিদ্ধান্ত নেওয়া নয়?

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছেন, বিষয়টি কেবল একটি সাক্ষাৎ নিয়ে বিতর্ক নয়—এটি জবাবদিহি ও স্বচ্ছতার পরীক্ষাও। কারণ, আজ যে দল বা নেতৃত্ব জনগণের সামনে “উন্মুক্ত সম্পর্ক” ও “স্বচ্ছতা”র কথা বলছে, তাদের কাছ থেকে প্রত্যাশা থাকবে—অতীতে ঘটে যাওয়া ঘটনাতেও একই মানদণ্ড প্রয়োগ করা। সেই হিসেবে এখন জনমনে যে প্রশ্নগুলো ঘুরছে, তার মধ্যে রয়েছে—ডা. শফিকুর রহমান কি এই সাক্ষাতের আলোচ্য বিষয়গুলোর সারসংক্ষেপ, সাক্ষাতের প্রেক্ষাপট, এবং কেন প্রকাশ না করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল—সে বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেবেন? তিনি কি জনস্বার্থে অন্তত এতটুকু জানাবেন যে, আলোচনাটি ছিল নীতিগত, নাকি নিছক সৌজন্যমূলক?

এ অবস্থায় নজর এখন জামায়াতের পরবর্তী পদক্ষেপে। তারা কি কেবল “ভবিষ্যতে প্রকাশ্যে আনব” বলেই আলোচনা শেষ করতে চাইবে, নাকি ইতোমধ্যে ঘটে যাওয়া ঘটনাটি নিয়েও পরিষ্কার, যাচাইযোগ্য ব্যাখ্যা দেবে? কারণ অনুসন্ধানী দৃষ্টিতে, স্বচ্ছতা মানে শুধু ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি নয়—অতীতের গোপনীয়তারও জবাবদিহি। এখন জনমনে মূল প্রশ্ন একটাই—এই সাক্ষাৎ কি সত্যিই সাধারণ সৌজন্য সাক্ষাৎ ছিল, নাকি এর পেছনে এমন কিছু ছিল যা প্রকাশ না করাই সুবিধাজনক মনে হয়েছিল?