২০১৮-র নির্বাচনে ৮০ শতাংশ কেন্দ্রে ভোট পড়েছিল রাতে, তদন্ত রিপোর্টে চাঞ্চল্যকর তথ্য

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অনুষ্ঠিত ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের অনিয়ম তদন্তে গঠিত কমিটি তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। সোমবার (১২ জানুয়ারি) প্রধান উপদেষ্টা কার্যালয়ে তদন্ত কমিটির প্রধান, হাইকোর্টের সাবেক বিচারপতি শামীম হাসনাইন এই রিপোর্ট হস্তান্তর করেন। প্রতিবেদনে বিগত তিনটি নির্বাচনকে একটি সুদূরপ্রসারী ‘মাস্টারপ্ল্যানের’ অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
রিপোর্ট হস্তান্তরের পর রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনার সামনে আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে বিচারপতি শামীম হাসনাইন জানান, ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক পরিবেশ তৈরির নাটক করা হলেও মূলত ৮০ শতাংশ কেন্দ্রে ভোট নেওয়া হয়েছিল আগের রাতেই। আওয়ামী লীগকে জেতাতে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মধ্যে এক ধরণের অসৎ প্রতিযোগিতা ছিল, যার ফলে কোনো কোনো কেন্দ্রে ভোট প্রদানের হার শতভাগের বেশি হয়ে গিয়েছিল।
তদন্ত কমিটির তথ্য অনুযায়ী, ২০০৮ সালের নির্বাচনের পর থেকেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করার মাধ্যমে ক্ষমতায় টিকে থাকার দীর্ঘমেয়াদী কৌশল গ্রহণ করা হয়। এই প্রক্রিয়ায় নির্বাচন কমিশনকে পাশ কাটিয়ে পুরো নির্বাচন ব্যবস্থাকে পুলিশ প্রশাসন ও গোয়েন্দা সংস্থার একটি অংশের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ করা হতো। এমনকি তৎকালীন সরকার নিজেদের পছন্দমতো লোক দিয়ে নির্বাচন কমিশন গঠন করেছিল বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।
২০১৪ সালের নির্বাচন সম্পর্কে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেটি ছিল সম্পূর্ণ অংশগ্রহণহীন একটি নির্বাচন। অন্যদিকে, ২০২৪ সালের নির্বাচনে বিরোধী দলগুলো অংশ না নেওয়ায় ‘ডামি প্রার্থী’ ও দলীয় বিদ্রোহী প্রার্থী দাঁড় করিয়ে নির্বাচনের নামে একটি বিশেষ কৌশল নেওয়া হয়। এসব পরিকল্পনার মূলে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ের নির্দেশনা ছিল বলে জানান কমিটির প্রধান।
রিপোর্টে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, বিরোধীদের দমনে বিচার বিভাগকেও ব্যবহার করা হয়েছে। সে সময় বিরোধী নেতা-কর্মীদের নামে শত শত মামলা দিয়ে তাদের গ্রেফতার করা হয় এবং আদালতে গেলে জামিন দেওয়া হতো না। বিচারপতি শামীম হাসনাইন বলেন, “নির্বাচন সেল নামে কিছু বিশেষ সেল গঠন করা হয়েছিল, যার মাধ্যমে মাঠ পর্যায়ে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের ব্যবহার করে ভোটের ফলাফল নিয়ন্ত্রণ করা হতো।”
সাবেক বিচারপতি শামীম হাসনাইনের নেতৃত্বাধীন এই পাঁচ সদস্যের কমিটিতে আরও ছিলেন সাবেক অতিরিক্ত সচিব শামীম আল মামুন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক কাজী মাহফুজুল হক, আইনজীবী তাজরিয়ান আকরাম হোসাইন এবং নির্বাচন বিশেষজ্ঞ মো. আবদুল আলীম। এই চাঞ্চল্যকর রিপোর্ট জমা পড়ার পর এখন সবার নজর পরবর্তী আইনি বা প্রশাসনিক পদক্ষেপের দিকে।