↩ নিউজ
প্রিন্ট এর তারিখঃ ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ৯:০০ পি.এম || প্রকাশের তারিখঃ ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ৪:৪৪ পি.এম

জাসদ ছাত্রলীগ থেকে জামায়াতের শীর্ষ পদ: শফিকুর রহমানের রাজনৈতিক পথপরিক্রমা

✍️ প্রতিবেদক: দীপ্ত বাংলাদেশ নিউজ ডেস্ক

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর বর্তমান আমীর ডা. শফিকুর রহমানের রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়েছিল বামপন্থী ছাত্র সংগঠন জাসদ ছাত্রলীগের হাত ধরে। তবে সিলেটের মুরারিচাঁদ (এমসি) কলেজে পড়ার সময় হোস্টেলের একটি ‘গোপন’ কার্যক্রমের মাধ্যমে তার রাজনৈতিক আদর্শে আমূল পরিবর্তন আসে। বর্তমানে তিনি দলটিকে একটি নতুন আঙ্গিকে উপস্থাপনের চেষ্টা করছেন, যা রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

জাসদ থেকে শিবিরের যাত্রা: শফিকুর রহমানের জন্ম ১৯৫৮ সালে মৌলভীবাজারের কুলাউড়ায়। দলের ওয়েবসাইট ও তার জীবনী অনুযায়ী, ১৯৭৩ সালে তিনি জাসদ ছাত্রলীগের মাধ্যমে ছাত্র রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হন। ১৯৭৬ সালে এইচএসসি পাসের পর সিলেট মেডিকেল কলেজে ভর্তি হওয়ার আগে এমসি কলেজে থাকাকালীন তিনি জাসদ ছাত্রলীগের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েন। পরবর্তীকালে এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন, তৎকালীন জাসদ ছাত্রলীগের কিছু কর্মকাণ্ডে হতাশ হয়ে তিনি রাজনীতি থেকে কিছুটা দূরে সরে যান। সেই সময় কলেজ হোস্টেলের নিজের কক্ষেই তিনি একটি গোপন ইসলামী সংগঠনের সন্ধান পান, যা ছিল ইসলামী ছাত্রশিবির। ১৯৭৭ সালে তিনি ছাত্রশিবিরে যোগ দেন এবং সিলেট মেডিকেল কলেজ ও শহর শাখার সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।

জামায়াতে যোগদান ও নেতৃত্ব: ১৯৮৩ সালে এমবিবিএস ডিগ্রি অর্জনের পর ১৯৮৪ সালে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দেন। সিলেটে শহর ও জেলা আমীরের দায়িত্ব পালনের পর তিনি কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে সক্রিয় হন। বিশেষ করে ২০১৩ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে জামায়াতের শীর্ষ নেতাদের অনেকের যুদ্ধাপরাধের মামলায় ফাঁসি হওয়ার পর দলে যে নেতৃত্ব শূন্যতা তৈরি হয়েছিল, সেই কঠিন সময়ে তিনি দলের হাল ধরেন। ২০১১ সালে তিনি ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল এবং ২০১৯ সালে প্রথমবারের মতো রুকনদের প্রত্যক্ষ ভোটে আমীর নির্বাচিত হন।

রাজনৈতিক ভিন্ন মাত্রা: বিশ্লেষকদের মতে, শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে জামায়াতে ইসলামী তার চিরাচরিত সাংগঠনিক খোলস ভেঙে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছে। দৈনিক নয়াদিগন্তের সম্পাদক সালাহউদ্দিন মুহাম্মদ বাবরের মতে, তিনি দলটিকে নির্দিষ্ট পরিমণ্ডলে আটকে না রেখে সব মহলের কাছে নিয়ে এসেছেন। তার আমলেই জামায়াত প্রথমবারের মতো সংখ্যালঘু ও মুক্তিযোদ্ধাদের দলে ভিড়িয়ে সংসদ নির্বাচনের জন্য মনোনয়ন দেওয়ার মতো সাহসী পদক্ষেপ নিয়েছে। একে জামায়াতের ইতিহাসে একটি ‘ভিন্ন ডাইমেনশন’ হিসেবে দেখা হচ্ছে।

সংশয় ও বিতর্ক: শফিকুর রহমানের জাসদ ছাত্রলীগ করার দাবি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে ভিন্ন মত রয়েছে। তৎকালীন জাসদ নেতা ডা. মুশতাক হোসেন ও শরীফ নূরুল আম্বিয়া জানিয়েছেন, সেই সময়ে জাসদ ছাত্রলীগের জোয়ার থাকলেও শফিকুর রহমানের সক্রিয় অংশগ্রহণের কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণ তাদের কাছে নেই। অনেকের ধারণা, মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী পরিস্থিতিতে নিজেকে নিরাপদ রাখতেই তিনি জাসদ ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার কৌশল অবলম্বন করেছিলেন। তবে শফিকুর রহমান নিজে দাবি করেছেন, তরুণ বয়সের প্রতিবাদী মানসিকতা থেকেই তিনি সেই স্রোতে গা ভাসিয়েছিলেন এবং পরে আদর্শিক কারণে সেখান থেকে সরে আসেন।

শফিকুর রহমানের এই রাজনৈতিক রূপান্তর এবং জামায়াতে ইসলামীকে আধুনিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রূপ দেওয়ার চেষ্টা দলটির ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে কী প্রভাব ফেলে, তা নিয়ে বর্তমানে সংশ্লিষ্ট মহলে গভীর পর্যবেক্ষণ চলছে। বিশেষ করে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে তার নেতৃত্ব ও কৌশল এখন বড় পরীক্ষার মুখে।

সুত্রঃ বিবিসি নিউজ বাংলা