দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার ও পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে ৯১৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য ১২টি বেসরকারি ইন্ডিপেন্ডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার (আইপিপি)-এর সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করেছে সরকার। উন্মুক্ত প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে সর্বনিম্ন ট্যারিফ নিশ্চিত করে এই চুক্তি সম্পন্ন হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী, প্রতি ইউনিট (কিলোওয়াট-ঘণ্টা) বিদ্যুতের গড় উৎপাদন ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ৭.৮০ সেন্ট, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৯ টাকা ১২ পয়সা। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগের গড় ব্যয়ের তুলনায় এই খরচ প্রায় আড়াই সেন্ট কম।
বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী রেজাউল করিম জানান, আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর সরকারি উদ্যোগের অংশ হিসেবে এই চুক্তি করা হয়েছে। আগে যেখানে বিদ্যুতের ইউনিটপ্রতি গড় উৎপাদন ব্যয় ছিল প্রায় ১০.৫ সেন্ট, নতুন চুক্তিতে তা ২ থেকে ৩ সেন্ট কমে এসেছে। এর ফলে সামগ্রিক বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে।
কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বর্তমান সরকার পূর্ববর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের বাতিল করা ছয়টি বিদ্যুৎ প্রকল্প পুনরায় বহাল করেছে এবং কম দামে বিদ্যুৎ পাওয়ার লক্ষ্যে নতুন আরও ছয়টি প্রকল্প গ্রহণ করেছে। এই ১২টি প্রকল্পের আওতায় নির্মিতব্য বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো আগামী দুই বছরের মধ্যে উৎপাদনে যাবে এবং সবগুলো জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে। এর মধ্যে চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে সবচেয়ে বড় ২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন কেন্দ্রটি নির্মিত হবে। এছাড়া পাবনার ঈশ্বরদীতে ১৫০ মেগাওয়াটের একটি কেন্দ্র এবং কক্সবাজারে দুটি ১০০ মেগাওয়াটের সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হবে। বাগেরহাটের মোংলায় ১০০ মেগাওয়াট এবং ঈশ্বরদীতে আরও একটি ৭০ মেগাওয়াটের সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মিত হবে। অবশিষ্ট ১০ থেকে ৫০ মেগাওয়াট ক্ষমতার কেন্দ্রগুলো মৌলভীবাজার সদর ও বিবিয়ানা, নীলফামারীর জলঢাকা, ফটিকছড়ি ও হাটহাজারী এবং নোয়াখালীর সুধারামে স্থাপন করা হবে।
চুক্তিবদ্ধ আইপিপি উদ্যোক্তা ও কনফিডেন্স পাওয়ারের চেয়ারম্যান ইমরান করিম জানান, তার তিনটি প্রতিষ্ঠান মোট ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়েছে। ইতিমধ্যে একটি কেন্দ্রের জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে এবং বাকি দুটির প্রক্রিয়া চলছে। তাদের সৌরবিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো ২০২৮ থেকে ২০২৯ সালের মধ্যে বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাবে।
বর্তমানে দেশে উৎপাদিত ১ হাজার ৪৫১ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ দেশের মোট উৎপাদন সক্ষমতার প্রায় ৫.০১ শতাংশ। এর মধ্যে ১,০Nz.৫ মেগাওয়াট অন-গ্রিড এবং ৩৭৭.১৭ মেগাওয়াট অফ-গ্রিড ব্যবস্থায় রয়েছে। স্রেডার তথ্য অনুযায়ী, জলবিদ্যুৎ, বায়ুশক্তি ও বায়োমাসসহ দেশে বর্তমানে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ১,৭৪৩.৭৬ মেগাওয়াট। এর আগে ২০২৪ সালে ক্ষমতায় আসার পর অন্তর্বর্তী সরকার ৩১টি নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প বাতিল করেছিল, যার মধ্যে ২৭টিই ছিল সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প।
জ্বালানি বিশ্লেষক শফিকুল আলম মনে করেন, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে এবং নীতিমালার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে সরকারের একটি সমন্বিত জ্বালানি মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করা প্রয়োজন। অন্যদিকে, ক্লিন-এর প্রধান নির্বাহী হাসান মেহেদি জানান, পূর্বে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য অধিগ্রহণ করা প্রায় ১৩ হাজার একর অব্যবহৃত জমি যদি সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পে ব্যবহার করা যায়, তবে বিদ্যুতের ইউনিটপ্রতি খরচ ২৩ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব। আন্তর্জাতিক নবায়নযোগ্য জ্বালানি সংস্থার (আইআরইএনএ) তথ্যমতে, বর্তমানে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে বিশ্বে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে চীন, যার পরেই রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত।



