জুন থেকে বাড়ছে বিদ্যুতের দাম: পাইকারিতে ১৯.৮৫% ও খুচরায় ১৬.৬৮% বৃদ্ধির ঘোষণা বিইআরসির

✍️ প্রতিবেদক: দীপ্ত বাংলাদেশ নিউজ ডেস্ক

দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির পর এবার বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে সরকার। এতে পাইকারি ও খুচরা—উভয় পর্যায়েই বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে, যার প্রভাব পড়বে সব শ্রেণির গ্রাহকদের ওপর।

গত বুধবার বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে নতুন এই মূল্য তালিকা প্রকাশ করা হয়। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম গড়ে ১৯.৮৫ শতাংশ এবং খুচরা বা গ্রাহক পর্যায়ে গড়ে ১৬.৬৮ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। এর পাশাপাশি সঞ্চালন চার্জও ২৩.৯৬ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়েছে। নতুন এই বর্ধিত দাম চলতি জুন মাস থেকেই কার্যকর হবে বলে কমিশন জানিয়েছে।

বিইআরসির আদেশ অনুযায়ী, পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের বর্তমান গড় দাম ৭ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৮ টাকা ৩৯ পয়সা করা হয়েছে। অর্থাৎ প্রতি ইউনিটে বেড়েছে ১ টাকা ৩৯ পয়সা। অন্যদিকে খুচরা পর্যায়ে প্রতি ইউনিটের গড় দাম ৯ টাকা ১১ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ১০ টাকা ৬৩ পয়সা (১০.৬৩ টাকা) করা হয়েছে, যা ইউনিট প্রতি ১ টাকা ৫২ পয়সা বেশি। আবাসিক, কৃষি, শিল্প, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানসহ সব ধরনের গ্রাহককেই এই বর্ধিত রেটে বিল পরিশোধ করতে হবে।

আবাসিক গ্রাহকদের মধ্যে সর্বনিম্ন স্তরের লাইফলাইন শ্রেণিতে (যারা মাসে সর্বোচ্চ ৫০ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার করেন) প্রতি ইউনিটের দাম ৫ টাকা ৩২ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে, যা আগের চেয়ে ৬৯ পয়সা বেশি। এর ফলে এই শ্রেণির গ্রাহকদের মাসিক বিল আনুমানিক ৩৪ টাকা ৫০ পয়সা বৃদ্ধি পাবে। এছাড়া ০-৭৫ ইউনিট ব্যবহারকারীদের জন্য ইউনিট প্রতি নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ টাকা ১৮ পয়সা, যেখানে ইউনিট প্রতি বেড়েছে ৯২ পয়সা। নিম্নমধ্যবিত্তদের ব্যবহারের স্তর হিসেবে পরিচিত ৭৬-২০০ ইউনিটের ক্ষেত্রে প্রতি ইউনিটের দাম ১ টাকা ৩ পয়সা বাড়িয়ে ৮ টাকা ৫০ পয়সা করা হয়েছে।

অন্যান্য খাতের মধ্যে কৃষি সেচে ব্যবহৃত বিদ্যুতের ইউনিট প্রতি নতুন দর ৬ টাকা ৪ পয়সা করা হয়েছে। ক্ষুদ্র শিল্পে প্রতি ইউনিটের গড় দাম ১২ টাকা ৭৩ পয়সা এবং বাণিজ্যিক ও অফিসের ক্ষেত্রে ১৫ টাকা ৩৬ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, উপাসনালয় ও হাসপাতালের জন্য নতুন দর ইউনিট প্রতি ৯ টাকা ৫ পয়সা এবং বৈদ্যুতিক গাড়ির চার্জিং স্টেশনের জন্য নতুন দর ১১ টাকা ৩৬ পয়সা করা হয়েছে। তাছাড়া বৃহৎ শিল্প খাতের (৩৩ কেভি এবং ১৩২-২৩০ কেভি) ক্ষেত্রে প্রতি ইউনিটে ২ টাকা করে দাম বাড়ানো হয়েছে।

খাতসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, পাইকারি দাম বাড়ানোর ফলে পিডিবির বার্ষিক আয় প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা বৃদ্ধি পাবে, যা সরকারের ভর্তুকির চাপ কিছুটা কমাতে সাহায্য করবে। তবে এই মূল্যবৃদ্ধির পরও সরকারকে এ খাতে আরও ৪১ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হবে। অন্যদিকে খুচরা মূল্যবৃদ্ধির কারণে গ্রাহকদের কাছ থেকে বছরে অতিরিক্ত প্রায় সাড়ে ১৫ হাজার কোটি টাকারও বেশি সংগৃহীত হবে।

এবারের দাম নির্ধারণের প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত দ্রুততম সময়ে সম্পন্ন হয়েছে। গত মে মাসের শুরুতে প্রস্তাব জমার পর ২০ ও ২১ মে গণশুনানি অনুষ্ঠিত হয়। শুনানির পর সাধারণত ৬০ কার্যদিবস সময় থাকলেও এবার মাত্র তিন কার্যদিবসের মধ্যে নতুন দাম ঘোষণা করেছে বিইআরসি। দ্রুত সিদ্ধান্তের বিষয়ে কোনো রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক চাপ ছিল না উল্লেখ করে বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ জানান, নতুন বাজেট প্রস্তাবের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত এই আদেশ দেওয়া হয়েছে।

ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম এই মূল্যবৃদ্ধির বিষয়ে ভিন্ন মত পোষণ করেছেন। তিনি জানান, বিদ্যুৎ খাতের অপ্রয়োজনীয় ব্যয় ও ক্যাপাসিটি চার্জের দায় সাধারণ ভোক্তার ওপর চাপানো ঠিক হয়নি। সরকারের উচিত ছিল খরচ কমিয়ে সাশ্রয়ের মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি ও আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার জেরে দেশে তেলের দাম বাড়ার পর বিদ্যুতের এই দাম বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কিছুটা বাড়িয়ে দেবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্টরা।