ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভূমিধস জয় পেয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)—এমন দাবি করে এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গতকাল অনুষ্ঠিত শান্তিপূর্ণ নির্বাচনে সর্বশেষ পাওয়া বেসরকারি তথ্য অনুযায়ী ২১৩টি আসনে বিএনপি ও বিএনপি-সমর্থিত জোটের প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন। একই তথ্যে জামায়াতে ইসলামী-সমর্থিত জোটের প্রার্থীরা ৭৭টি আসনে জয়ী হয়েছেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে আসনভিত্তিক বিভাজনে বলা হয়, ৭৭ আসনের মধ্যে জামায়াত ৬৮, এনসিপি ৬ এবং খেলাফত মজলিস ৩টি আসনে জয়ী হয়েছে। পাশাপাশি স্বতন্ত্র প্রার্থীরা ৮টি আসনে জয়ী হয়েছেন এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের একজন প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন বলেও দাবি করা হয়।
তবে নির্বাচন কমিশনের আনুষ্ঠানিক ফল ঘোষণার বিষয়ে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, রাত পৌনে তিনটা পর্যন্ত ইসি মাত্র ১০টি আসনের ফলাফল আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করে। একই সময়ে রাজধানী ঢাকার আসনগুলোর একটিরও ফলাফল আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়নি বলে জানানো হয়।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, নির্বাচনের পাশাপাশি জুলাই জাতীয় সনদ চূড়ান্তে গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে বেশি ভোট পড়েছে। যদিও ভোটের হার এবং ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে কত শতাংশ ভোট পড়েছে—ভোর রাতে প্রতিবেদন লেখার সময় পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন জানাতে পারেনি বলে উল্লেখ করা হয়।
এদিকে দুই-তৃতীয়াংশ আসনে বিজয়ের ভিত্তিতে সরকার গঠনের নিরঙ্কুশ সমর্থন পেয়েছে বিএনপি—এমন দাবি তুলে দলীয় অবস্থানও তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, এই বড় জয় উদযাপনে কোনো বিজয় মিছিল না করার ঘোষণা দিয়েছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। পাশাপাশি আজ শুক্রবার সারাদেশের মসজিদে দোয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে এবং কোনো ধরনের সমাবেশ না করার নির্দেশনা দেওয়া হবে বলেও উল্লেখ করা হয়। নির্বাচন শান্তিপূর্ণ হওয়ায় দেশবাসীকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস—এ কথাও প্রতিবেদনে আছে।
প্রতিবেদনে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি আসনে প্রার্থী-ফলাফলও উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়, বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান ঢাকা ও বগুড়ার দুই আসন থেকে বিজয়ী হয়েছেন। ঢাকার দুই আসন থেকে জামায়াত আমীর ডা. শফিকুর রহমান এবং এনসিপি আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বিজয়ী হয়েছেন বলেও দাবি করা হয়। অন্যদিকে খেলাফত মজলিসের আমীর মাওলানা মামুনুল হক, এবি পার্টির চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান মঞ্জু এবং জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার পরাজিত হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
ঢাকার ফলাফলের চিত্র তুলে ধরে বলা হয়, ২০টি আসনের মধ্যে প্রাপ্ত ফলে ১৪টিতে বিএনপি প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন এবং জামায়াত ও এনসিপি মিলিয়ে ৬ জন প্রার্থী জয়ী হয়েছেন। বিভাগীয় ফলাফলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, সিলেট বিভাগে ১৭টি আসনের মধ্যে একটি ছাড়া সব আসনে বিএনপি প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন। এছাড়া দেশের পূর্বাঞ্চল ও দক্ষিণাঞ্চলেও বিএনপি ভালো ফল করেছে বলে উল্লেখ আছে। অপরদিকে উত্তরাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চলে জামায়াত-সমর্থিত জোটের প্রার্থীরা ভালো ফল করেছেন—এমন দাবিও করা হয়।
ভোটগ্রহণ প্রসঙ্গে প্রতিবেদনে বলা হয়, বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকাল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত ব্যালট পেপারে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয় এবং ২৯৯টি আসনে সহিংসতামুক্ত, উৎসবমুখর পরিবেশে নির্বাচন হয়েছে। নির্বাচনের দিন সংঘাত-সংঘর্ষের জেরে কোনো প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি বলেও দাবি করা হয়। নির্বাচনের নিরাপত্তায় সেনাবাহিনী, বিজিবি, র্যাব, পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ৯ লক্ষাধিক সদস্য মোতায়েন ছিল এবং ভোটকেন্দ্রের বাইরে সেনাবাহিনী ও বিজিবি স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকেও বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিন বলেছেন, জাতিকে যে ওয়াদা দেওয়া হয়েছিল, তা ‘পরিপূর্ণ’ করতে পেরেছেন—এবং কমিশন ‘সম্পূর্ণ ট্রান্সপারেন্ট’ নির্বাচন দেওয়ার চেষ্টা করেছে। তিনি আরও বলেন, কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকবেই, তবে বড় পরিসরে ব্যালট ছাপানো ও বিতরণের কাজ সম্পন্ন করে নির্বাচন আয়োজন সফল হয়েছে বলে তারা মনে করেন।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান কয়েকটি আসনে রিটার্নিং অফিসাররা ফল ঘোষণা না করে ‘ঝুলিয়ে’ রেখেছেন—এমন অভিযোগ করেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়। তিনি দাবি করেন, কিছু আসনে তারা এগিয়ে আছেন এবং গণনাও সম্পন্ন, কিন্তু ফল ঘোষণা করা হচ্ছে না। একই সঙ্গে তিনি আগে পুরো ফল পাওয়ার পর বিস্তারিত বলার কথা জানান এবং কিছু জায়গায় ‘ইঁদুর-বিড়াল খেলা’ চলছে বলেও অভিযোগ করেন। সংবাদ সম্মেলনে তার পাশে এনসিপি’র আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও খেলাফত মজলিসের আমীর মামুনুল হক উপস্থিত ছিলেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।



