ক্ষমতার পাদপ্রদীপে থেকেও জিয়া পরিবারের সংগ্রাম ও সংযমী জীবনের অজানা অধ্যায়: আর্থিক স্বচ্ছতার এক অনন্য উদাহরণ

✍️ প্রতিবেদক: দীপ্ত বাংলাদেশ নিউজ ডেস্ক

সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও তাঁর পরিবারের আর্থিক সততা ও সংযমী জীবনযাপন নিয়ে সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত এক স্মৃতিচারণা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। লেখক ফয়জুল লতিফ চৌধুরীর ফেসবুক পোস্টে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে এমন এক বাস্তবতা উঠে এসেছে, যেখানে রাষ্ট্রক্ষমতার শীর্ষে থেকেও পরিবারটি কোনোভাবেই বিলাসিতা বা ক্ষমতার সুবিধাভোগী জীবনের পথ বেছে নেয়নি।

স্মৃতিচারণা অনুযায়ী, ১৯৯০ সালে অস্ট্রেলিয়ার মনাশ ইউনিভার্সিটিতে এমবিএ অধ্যয়নকালে লেখকের সঙ্গে আরাফাত রহমান কোকোর পরিচয় হয়। সে সময় কোকো ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটিতে আন্ডারগ্রাজুয়েট পর্যায়ে পড়তে গিয়ে মারাত্মক আর্থিক সংকটে পড়েন। এক বা দুই সেমিস্টার শেষ হওয়ার পর তাঁর মা খালেদা জিয়ার পক্ষে আর নিয়মিত অর্থ পাঠানো সম্ভব হয়নি। ফলে পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায় এবং হাতে থাকা অর্থও একসময় ফুরিয়ে আসে। জীবনযাত্রা চালাতে কোকোকে পিজ্জা হাটে ডেলিভারি বয়ের কাজ করতে হয়। সপ্তাহান্তে রাত গভীর পর্যন্ত কাজ করে অনেক সময় ঠিকমতো খাওয়ার সুযোগও পেতেন না।

এই সময়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা স্মৃতিচারণায় বিশেষভাবে উঠে এসেছে। লেখক ঢাকা সফরের প্রস্তুতি নেওয়ার সময় কোকোর হাতে থাকা কিছু মার্কিন ডলার অস্ট্রেলিয়ান ডলারে রূপান্তরের জন্য ব্যাংকে যান। সেখানে জানা যায়, l ৫০টি একশ ডলারের নোট মোট পাঁচ হাজার ডলারের সবকটিই জাল। লেখকের বর্ণনা অনুযায়ী, বেগম খালেদা জিয়া বিশ্বাসভাজন হিসেবে বিবেচিত এক তৃতীয় ব্যক্তির মাধ্যমে ছেলের কাছে অর্থ পৌঁছানোর ব্যবস্থা করেছিলেন। ধারণা করা হয়, ওই ব্যক্তি দায়িত্বজ্ঞানহীনতা বা প্রতারণার মাধ্যমে জাল ডলারগুলো সরবরাহ করেন।

ডলারগুলো দেশে ফিরিয়ে খালেদা জিয়ার হাতে তুলে দেওয়া হলে তাঁকে গভীরভাবে ব্যথিত ও চিন্তিত দেখা যায়। তিনি ছেলের অস্ট্রেলিয়ায় থাকা-খাওয়ার খরচ সম্পর্কে বিস্তারিত খোঁজ নেন এবং স্পষ্ট ভাষায় বলেন, যিনি এই ডলারগুলো দিয়েছেন তিনি চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচয় দিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করেন যে, ওই ব্যক্তির কাছ থেকে প্রকৃত অর্থ উদ্ধার করা সম্ভব হবে কি না, তা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে। তাৎক্ষণিকভাবে নতুন করে টাকা পাঠানো তাঁর পক্ষে সম্ভব নয় বলেও তিনি সৎভাবে জানিয়ে দেন।

১৯৯১ সালে এরশাদ সরকারের পতন এবং পরবর্তী নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল ক্ষমতায় এসে খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হলেও কোকোর জীবনে তাৎক্ষণিক কোনো আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য আসেনি। টিউশন ফি’র অভাবে নতুন সেমিস্টারে পড়াশোনা চালানো সম্ভব না হওয়ায় কোকো দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নেন। খালেদা জিয়া নিজে চাননি তাঁর ছেলে ‘প্রধানমন্ত্রীর সন্তান’ হিসেবে বড় হোক বা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ছায়ায় বিশেষ সুবিধা ভোগ করুক।

স্মৃতিচারণায় আরও উল্লেখ করা হয়, ব্যক্তিগত আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রেও খালেদা জিয়ার অবস্থান ছিল কঠোর ও নৈতিক। কোকোর মাধ্যমে নেওয়া অর্থ তিনি যথাযথভাবে ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করেন এবং প্রয়োজনে নিরাপত্তাকর্মীদের দিয়ে সেই অর্থ পৌঁছে দেন। লেখকের ভাষায়, তিনি কখনোই চাননি তাঁর সন্তানরা ক্ষমতার দাপট দেখাক কিংবা বন্ধুদের তোষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হোক।

পরবর্তী সময়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে দায়িত্ব পালনকালে একনেক সভা ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে খালেদা জিয়ার সংযত আচরণ, কম কথা বলা এবং যুক্তিনির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণের দৃষ্টান্তও স্মৃতিচারণায় উঠে এসেছে। তদবিরের মাধ্যমে সুবিধা আদায়ের সংস্কৃতির বিরুদ্ধেও তিনি ছিলেন কঠোর।

রাজনীতির উত্তাল ও বিতর্কপূর্ণ প্রেক্ষাপটের মাঝেও এই স্মৃতিগুলো খালেদা জিয়া পরিবারের আর্থিক সততা, ক্ষমতার প্রতি অনাসক্তি এবং বিলাসী জীবন বর্জনের একটি বিশদ ও গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *