অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই নিজেদের কূটনৈতিক বা ‘লাল পাসপোর্ট’ জমা দেওয়ার হিড়িক পড়েছে উপদেষ্টাদের মধ্যে। অর্থ, স্বরাষ্ট্র, তথ্য, পরিবেশ এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষাসহ গুরুত্বপূর্ণ অন্তত সাতটি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টারা ইতোমধ্যে তাদের বিশেষ পাসপোর্ট সমর্পণ করে সাধারণ পাসপোর্টের জন্য আবেদন করেছেন। শুধু উপদেষ্টারা নন, এই তালিকায় প্রধান উপদেষ্টার দুইজন বিশেষ সহকারী, পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি), সরকারের পূর্ণাঙ্গ সচিব এবং উচ্চ আদালতের কয়েকজন বিচারকও রয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
কূটনৈতিক পাসপোর্ট জমা দেওয়া উপদেষ্টাদের তালিকায় রয়েছেন অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ, স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি উপদেষ্টা মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান, তথ্য ও পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, গৃহায়ন ও গণপূর্ত উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. বিধান রঞ্জন রায় পোদ্দার। এ ছাড়া প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব ও আইজিপি বাহারুল আলমও তাদের পাসপোর্ট জমা দিয়েছেন।
বিষয়টি নিয়ে সচিবালয় ও রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক কানাঘুষা চলছে। পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন এই পদক্ষেপকে ‘অস্বাভাবিক’ আখ্যা দিয়ে জানিয়েছেন, তিনি বা তার স্ত্রী পাসপোর্ট জমা দেননি। তবে তিনি উল্লেখ করেন, দায়িত্ব শেষে পাসপোর্ট পেতে দীর্ঘসূত্রতা বা ইমিগ্রেশনে অনাপত্তি সনদ (এনওসি) সংক্রান্ত আইনি জটিলতা এড়াতে কেউ কেউ এই কৌশল অবলম্বন করতে পারেন। তার মতে, পদের মেয়াদ থাকাকালীন আবেদন করলে দ্রুত পাসপোর্ট পাওয়ার নিশ্চয়তা থাকে, যা ব্যক্তিগত ভ্রমণের ক্ষেত্রে সহায়ক হয়।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সমালোচকদের একাংশ একে ‘সেফ এক্সিট’ বা নিরাপদ প্রস্থানের কৌশল হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, উপদেষ্টাদের মধ্যে অনেকেরই দ্বৈত নাগরিকত্ব রয়েছে এবং নির্বাচনের পর দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি পরিবর্তনের আশঙ্কায় তারা আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিচ্ছেন। অভিযোগ উঠেছে যে, দায়িত্ব ছাড়ার পরপরই দ্রুত বিদেশে পাড়ি দিতে এবং সম্ভাব্য আইনি বা ভিসা সংক্রান্ত জটিলতা এড়াতেই সাধারণ পাসপোর্টের এই আবেদন। যদিও পূর্বে এক প্রতিক্রিয়ায় পরিবেশ উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান বলেছিলেন যে তার কোনো ‘সেফ এক্সিটের’ প্রয়োজন নেই, তবে তিনিও শেষ পর্যন্ত লাল পাসপোর্ট জমা দিয়েছেন।
আইন অনুযায়ী, কূটনৈতিক পাসপোর্টের মেয়াদ পাঁচ বছর হলেও দায়িত্ব শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তা হস্তান্তর করা বাধ্যতামূলক। প্রশাসনিক বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় এবং অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ শেষের দিকে হওয়ায় ঝামেলা এড়াতে এই প্রবণতা বাড়ছে। দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তার মতে, উপদেষ্টারা পদে থাকাকালীন আবেদন করলে দ্রুত পাসপোর্ট হাতে পান, যা সাধারণ নাগরিক হিসেবে পাওয়া অনেক সময় অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। উদ্ভূত এই পরিস্থিতিতে উপদেষ্টাদের এমন সিদ্ধান্ত প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক মহলে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।



