‘বুকভরা হতাশা’ নিয়ে এনসিপি নেতার পদত্যাগ

✍️ প্রতিবেদক: দীপ্ত বাংলাদেশ নিউজ ডেস্ক

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় কমিটির দক্ষিণাঞ্চলের সংগঠকের পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন আরিফুল ইসলাম তালুকদার। ২৮ নভেম্বর তিনি দলের আহ্বায়কের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে তার পদত্যাগপত্র জমা দেন। পদত্যাগপত্রে তিনি দলটির নেতৃত্বের বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর অভিযোগ এনেছেন এবং তার এই সিদ্ধান্তকে ‘বুকভরা হতাশা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

আরিফুল ইসলাম তালুকদার চিঠিতে উল্লেখ করেন, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। তার অভিযোগ, দলটি অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে পারেনি এবং বিভিন্ন জায়গায় ক্ষমতার অপব্যবহার, সিদ্ধান্তহীনতা ও অনিয়মের কারণে তিনি পদত্যাগ করছেন।

সদস্য সচিব বরাবর লেখা চিঠিতে তিনি জানান, তিনি জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)-এর প্রতিষ্ঠাকালীন আহ্বায়ক কমিটির সংগঠকের দায়িত্ব পেয়েছিলেন। তবে পদ-পদবি নিয়ে তার কোনো আগ্রহ ছিল না। তার মূল লক্ষ্য ছিল ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের আন্দোলনের দেশপ্রেমিক তারুণ্যের শক্তি একত্রিত হয়ে বাংলাদেশে তারুণ্যের নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত তৈরি করবে। যদিও একতাবদ্ধ তারুণ্যের শক্তি গঠিত হওয়ার দ্বারপ্রান্তে এসেও কিছু হীনমন্যতা ও অদূরদর্শী আচরণের কাছে পরাজিত হয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, একই প্রেক্ষাপটে উঠে আসা দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের একটি অংশ বিস্ময়কর রকম অর্থসম্পদের মালিক হয়েছে। এই বিষয়টি সাধারণ জনগণসহ জুলাইয়ের সকল শরিকের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। এই বলয়টি জুলাইয়ের সম্পূর্ণ অবদান নিজেদের কাছে কুক্ষিগত করে শরিকদের মধ্যে বৈষম্য সৃষ্টি করেছে, যার ফলে জাতীয় ঐক্য বিনষ্ট হয়েছে এবং বিপ্লব বিবর্ণ হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

আরিফুল ইসলাম তালুকদার আরও গুরুতর অভিযোগ এনেছেন যে, জুলাইয়ের আহতদের প্রকৃত তালিকাকরণে সীমাহীন অবিচার করা হয়েছে। তার মতে, জুলাই বিপ্লবের ফলে সৃষ্ট রাষ্ট্রের প্রায় অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র একটি নির্দিষ্ট বলয় দখল করেছে। সচিবালয়সহ পুরো রাষ্ট্রের ৯০ ভাগেরও বেশি ফ্যাসিবাদী আমলা এখনও বহাল রয়েছে। পাশাপাশি, গণহত্যার বিচারের দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়া এবং গণহত্যাকারী আওয়ামী লীগ ও তাদের দোসর জাতীয় পার্টিসহ ১৪ দলের বিষয়ে যথাযথ কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ার বিষয়টি তাকে ব্যথিত করেছে।

তিনি বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করেছেন যে, যে আমলারা বিগত তিনটি নির্বাচন মাফিয়ার হয়ে করে দিয়েছে, সেই আমলাদের মাধ্যমেই আগামী নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি সম্পন্ন। তিনি আরও অভিযোগ করেন, মাফিয়া রেখে যাওয়া রাষ্ট্রপতির অধীনেই সবকিছু পরিচালিত হচ্ছে এবং এসবের বিরুদ্ধে কোনো কথা বলা হচ্ছে না। একের পর এক ক্ষমতার অপব্যবহার, অনিয়ম, নিজস্ব বলয়-সৃষ্টি ও দুর্নীতির বিষয়গুলো সামনে আসছে, যার দায়ভার তাকেও নিতে হচ্ছে বলে তিনি মনে করেন।

চিঠিতে তিনি সরাসরি দলের নেতৃত্বকে দায়ী করে বলেন, বিপ্লবোত্তর দেশের এই সংকটের দায় সম্পূর্ণরূপে তাদেরই। তিনি উল্লেখ করেন, অভ্যুত্থানের শক্তি হিসেবে যারা বছরের পর বছর জীবন ও ক্যারিয়ার বিসর্জন দিয়েছে, তাদের স্বীকৃতি কেড়ে নেওয়ার দায়সহ দেশের উদ্ভূত সংকটগুলোর দায় কেবল তাদের, যারা অভ্যুত্থানের শক্তি হিসেবে নিজেদের বলয়কে প্রতিষ্ঠিত করেছে এবং অভ্যুত্থানের উদ্দেশ্যকে ব্যর্থ করেছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের উপদেষ্টা পরিষদ গঠনের দায়িত্ব পালনে নেতৃত্ব পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

আরিফুল ইসলাম তালুকদার তার পদত্যাগপত্রে লেখেন, তিনি জুলাই বিপ্লবে আন্তর্জাতিক যোগাযোগগুলো সম্পন্ন করেছিলেন এবং মাফিয়ার পলায়নে তার প্রত্যক্ষ অবদান রয়েছে, যা দলের আহ্বায়ক জানেন না। তার মতে, এনসিপি যেহেতু জুলাইয়ের তারুণ্যের শক্তিকে একত্রিত করতে পারেনি এবং জাতীয় ঐক্য বিনষ্ট করেছে, মূলত দলটি ক্ষমতার জন্যই সব করছে এবং গত ৫৪ বছরের রাজনৈতিক সংস্কৃতির ধারাবাহিকতাই রক্ষা করছে।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, তার দলটি বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্মীয় অনুভূতির বিষয়ে বিস্ময়কর রকম উদাসীন। তার পর্যবেক্ষণে, বর্তমানে দলটি নিয়ন্ত্রণ করছে এমন একটি বলয় যারা এদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের অনুভবকে ধারণ করে না, বরং বিদ্বেষ লালন করে। এসব বিষয় বিবেচনা করে তিনি দলটির সঙ্গে ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পথচলার কোনো প্রয়োজন অনুভব করছেন না। এই দুঃখভরা হৃদয় ও এক বুক হতাশা নিয়ে তিনি দল থেকে পদত্যাগ করলেন। তবে তিনি আশা প্রকাশ করেন, ’২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের প্রত্যাশিত তারুণ্যের রাজনীতি বিনির্মাণের সম্ভাবনা জাগ্রত হলে ভবিষ্যতে আবার একসঙ্গে রাজপথে দেখা হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *