গত দেড় দশকে ডিজিটাল বাংলাদেশের আড়ালে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে সংঘবদ্ধ লুটপাট ও দুর্নীতির বিস্তারিত খতিয়ান তুলে ধরেছে অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত শ্বেতপত্র কমিটি। বৃহস্পতিবার প্রকাশিত ৪৭২ পৃষ্ঠার এই প্রতিবেদনে আইসিটি অধিদপ্তর, বিসিসি, হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষ এবং এটুআইসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রকল্পে ভয়াবহ অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে। ১৩টি অধ্যায়ে বিভক্ত এই প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে কীভাবে উন্নয়ন প্রকল্পের মোড়কে রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন ও অর্থের প্রবাহ নিশ্চিত করা হয়েছিল।
এটুআই ও রাজনৈতিক বয়ান: শ্বেতপত্রের তথ্য অনুযায়ী, ‘এস্পায়ার টু ইনোভেট’ বা এটুআই প্রকল্পটি নাগরিক সেবার পরিবর্তে আওয়ামী লীগের ভাবমূর্তি নির্মাণ ও রাজনৈতিক বয়ান তৈরির হাতিয়ারে পরিণত হয়েছিল। নজরদারির বাইরে থাকা এই ‘সুপার ইউনিট’ ডিজিটাল বাংলাদেশ বা স্মার্ট সিটিজেনের মতো স্লোগান দিয়ে বিপুল অর্থ ব্যয় করলেও এর কোনো নির্ভরযোগ্য নাগরিক উপকারিতা পাওয়া যায়নি। এছাড়া একই কনসেপ্ট বারবার ব্যবহার করে নামমাত্র কর্মশালা ও সম্মেলনের মাধ্যমে প্রকল্পের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়েছে।
বিপুল ব্যয় ও অযৌক্তিক প্রকল্প: প্রতিবেদনে দেখা যায়, শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাব স্থাপন এবং সিআরআই-এর মাধ্যমে ‘মুজিব ভাই’ চলচ্চিত্র নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৪ হাজার ২১১ কোটি ২২ লাখ টাকা। এছাড়া ‘খোকা’ সিনেমার নামে ১৬ কোটি টাকা নেওয়া হয়েছে, যা আইসিটি খাতের কাঠামোগত উন্নয়নের চেয়ে রাজনৈতিক ইমেজ তৈরিতেই বেশি ব্যবহৃত হয়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে হাই-টেক পার্ক ও ট্রেনিং সেন্টারগুলো বাস্তব সক্ষমতা যাচাই ছাড়াই স্থাপন করা হয়েছে, যেখানে প্রশিক্ষক বা প্রশিক্ষণার্থী না থাকলেও বিল উত্তোলন করা হয়েছে শতভাগ।
স্বজনপ্রীতি ও জালিয়াতি: প্রশিক্ষণ ও ল্যাপটপ বিতরণের ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক পরিচয়কে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টে (এলইডিপি) জাল প্রশিক্ষক নিয়োগ এবং একই ব্যক্তির নামে একাধিক প্রতিষ্ঠানে বিল তোলার প্রমাণ মিলেছে। প্রতিযোগিতামূলক বাজারব্যবস্থা ভেঙে দিয়ে একটি নির্দিষ্ট সুবিধাভোগী চক্র আইসিটি খাতকে নিয়ন্ত্রণ করত বলে শ্বেতপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
উন্নয়ন অর্থনীতিবিদ ড. নিয়াজ আসাদুল্লাহর নেতৃত্বে গঠিত এই কমিটি আইসিটি খাতে স্বাধীন অডিট ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের সুপারিশ করেছে। তবে টিআইবি-র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান সতর্ক করেছেন যে, যথাযথ আইনি ব্যবস্থা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া এই শ্বেতপত্রও কেবল ‘ফাইলবন্দি দলিল’ হয়ে থাকার ঝুঁকিতে রয়েছে।



