বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি বর্তমানে একটি ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ অতিক্রম করছে। দলটির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান এবং দীর্ঘকালীন নেত্রী খালেদা জিয়ার উত্তরসূরি হিসেবে তারেক রহমান এখন দলের একক নেতৃত্বে সমাসীন। প্রথমবারের মতো তার প্রত্যক্ষ নেতৃত্বে বিএনপি জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে এবং তিনি নিজেও প্রথমবারের মতো সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। লন্ডনে ১৭ বছরের প্রবাস জীবন শেষে গত ডিসেম্বরে বীরোচিত সংবর্ধনার মাধ্যমে দেশে ফেরার পর তারেক রহমান এখন বাংলাদেশের ‘সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী’ হিসেবে সমর্থকদের কাছে উপস্থাপিত হচ্ছেন।
নেতৃত্বে অভিষেক ও রাজনৈতিক পথচলা: ১৯৬৫ সালে জন্মগ্রহণ করা তারেক রহমানের রাজনৈতিক যাত্রা শুরু হয়েছিল আশির দশকে বগুড়ার গাবতলী উপজেলা বিএনপির সদস্য হিসেবে। ১৯৯১ ও ২০০১ সালের নির্বাচনে দলের জয়ে তিনি নেপথ্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ২০০২ সালে তাকে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব এবং ২০০৯ সালে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান করা হয়। ২০১৮ সালে খালেদা জিয়া কারাবন্দি হওয়ার পর থেকে তিনি লন্ডন থেকেই ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। তবে ২০২৫ সালের ৯ জানুয়ারি খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর দলের স্থায়ী কমিটির সভায় তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বিএনপির চেয়ারম্যানের পদে অভিষিক্ত হন। এর মাধ্যমেই জিয়া পরিবারের বড় সন্তানের হাতে দলের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ আসে।
অতীতের বিতর্ক ও ভাবমূর্তি পুনর্গঠন: তারেক রহমানের রাজনৈতিক জীবনে সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত অধ্যায় ছিল ২০০১-০৬ মেয়াদে ‘হাওয়া ভবন’ কেন্দ্রিক কর্মকাণ্ড। তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী শেখ হাসিনার সমাবেশে গ্রেনেড হামলা এবং বিভিন্ন দুর্নীতির অভিযোগে তাকে অভিযুক্ত করেছিল আওয়ামী লীগ সরকার। তবে তারেক রহমান ও বিএনপি বরাবরই এসব অভিযোগকে ‘রাজনৈতিক অপপ্রচার’ হিসেবে বর্ণনা করে আসছে। সম্প্রতি অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে তিনি এসব মামলা থেকে খালাস বা অব্যাহতি পেয়েছেন। তার নির্বাচনী হলফনামায় ৭৭টি মামলার তথ্য দেওয়া হয়েছে এবং শিক্ষাগত যোগ্যতা হিসেবে ‘উচ্চ মাধ্যমিক’ উল্লেখ করা হয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, দেশে ফেরার পর তারেক রহমান আগের চেয়ে অনেক বেশি পরিণত এবং তিনি নিজের একটি ‘ইতিবাচক ও মধ্যপন্থী’ ভাবমূর্তি তৈরির চেষ্টা করছেন।
নির্বাচনী চ্যালেঞ্জ ও রাজনৈতিক পরীক্ষা: বর্তমান নির্বাচনে বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগ অনুপস্থিত থাকায় দলটিকে এক সময়ের মিত্র জামায়াতে ইসলামীর মুখোমুখি হতে হচ্ছে। তারেক রহমানের একক নেতৃত্বের বড় চ্যালেঞ্জ হলো দল ভাঙতে না দেওয়া এবং বিদ্রোহীদের সামলানো। তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৫০টি আসনে বিএনপির নিজস্ব নেতারাই স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িয়েছেন, যা তারেক রহমানের জন্য একটি সাংগঠনিক পরীক্ষা। রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদের মতে, প্রতিকূল সময়ে দল সুসংহত রাখা তার বড় সাফল্য হলেও, এই নির্বাচনের ফলাফলই নির্ধারণ করবে তিনি কতটা সফল জাতীয় নেতা হয়ে উঠতে পারবেন।
উপসংহার: তারেক রহমান বর্তমানে বাংলাদেশের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন। দীর্ঘ প্রবাস জীবনের অভিজ্ঞতা এবং দেশের বর্তমান পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে তার নেওয়া রাজনৈতিক সিদ্ধান্তগুলো গভীর আগ্রহের সাথে পর্যবেক্ষণ করছে সাধারণ মানুষ। নির্বাচনী ময়দানে জামায়াতের সাথে লড়াই এবং দলের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা রক্ষা করার মাধ্যমেই তার নেতৃত্বের আসল সক্ষমতা প্রমাণিত হবে। এখন সবার নজর নির্বাচনের পরবর্তী রাজনৈতিক মেরুকরণের দিকে।
সুত্রঃ বিবিসি নিউজ বাংলা



