২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ৮ আগস্ট দায়িত্ব গ্রহণ করে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। বর্তমানে এই সরকারের দায়িত্ব পালনের প্রায় আঠারো মাস অতিক্রান্ত হতে চলেছে। মূলত ‘সংস্কার, বিচার ও নির্বাচন’—এই তিন মূল এজেন্ডা নিয়ে যাত্রা শুরু করা সরকারের সাফল্য ও ব্যর্থতা নিয়ে এখন রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে ব্যাপক বিশ্লেষণ চলছে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে এই সরকারের বিদায় নেওয়ার কথা রয়েছে।
নির্বাচন ও সংস্কারের পথে অগ্রগতি: রাজনৈতিক দলগুলোর দ্রুত নির্বাচনের চাপের মুখে সরকার আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেছে। একই দিনে সংবিধানসহ বিভিন্ন বিষয়ে সংস্কারের চারটি সুনির্দিষ্ট প্রশ্নে গণভোটও অনুষ্ঠিত হবে। সরকার রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে মোট ১১টি কমিশন গঠন করেছিল, যার সুপারিশের ভিত্তিতে ২৫টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে অন্তত ৩০টি বিষয়ে জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের মতে, বাংলাদেশের ইতিহাসে এত কম সময়ে এত বেশি সংস্কার কাজ আর কখনো হয়নি। তবে টিআইবি প্রধান ড. ইফতেখারুজ্জামান মনে করেন, সংস্কার প্রক্রিয়াটি অনেক ক্ষেত্রে ‘পিক অ্যান্ড চুজ’ ও অ্যাডহকিজমের শিকার হয়েছে, যার ফলে শিক্ষাখাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কোনো সংস্কার কমিশনই গঠিত হয়নি।
বিচারের ক্ষেত্রে মাইলফলক ও বিতর্ক: সরকারের অগ্রাধিকার তালিকার শীর্ষে থাকা জুলাই হত্যাকাণ্ডের বিচারে বড় ধরনের অগ্রগতি হয়েছে। গত ১৭ নভেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করে। এ ছাড়া ৮৩৭টি হত্যা মামলার মধ্যে ৪৫টির বিচার ট্রাইব্যুনালে চলছে। গুম ও খুনের বিচারে সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের আইনের আওতায় আনাকেও একটি ইতিবাচক অর্জন হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে ঢালাও হত্যা মামলা এবং কোনো স্পষ্ট প্রমাণ ছাড়াই সাংবাদিক, শিক্ষক ও বিভিন্ন পেশার মানুষকে আসামি করা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। ড. ইফতেখারুজ্জামানের মতে, স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে ‘বিচার নাকি প্রতিশোধ’—সেই প্রশ্ন ওঠার সুযোগ থেকে যায়।
অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ ও সাফল্য: অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফেরাতে সরকার বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে। দায়িত্ব নেওয়ার সময় বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ১৪ বিলিয়ন ডলার থাকলেও বর্তমানে তা বেড়ে ২৮ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে ৫টি দুর্বল ব্যাংক একীভূত করা হয়েছে এবং পাচার হওয়া অর্থ ফেরাতে আন্তর্জাতিক উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস তুলছে মূল্যস্ফীতি। ডিসেম্বর মাসে সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৮.৪৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন মনে করছেন সামষ্টিক অর্থনীতি স্থিতিশীল হচ্ছে, তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, চালের দাম না কমার কারণে খাদ্য মূল্যস্ফীতি এখনো উচ্চপর্যায়ে রয়ে গেছে।
আইন-শৃঙ্খলা ও সামাজিক নিরাপত্তার সংকট: মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ‘মব সংস্কৃতি’ ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড একটি বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত অন্তত ৪০টি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ছাড়া ঢাকায় প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার ভবনে হামলা, মাজার ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে ভাঙচুর এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর বিচ্ছিন্ন হামলার ঘটনায় সরকারের কার্যকর পদক্ষেপের অভাব দেখা গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের মতে, সরকার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে কিছুটা এগুলেও সামাজিক স্থিতিশীলতা রক্ষার ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছে। বিশেষ করে নারীদের ওপর হামলা ও হেনস্থার ঘটনাগুলো ‘নতুন বাংলাদেশ’-এর স্বপ্নের পথে বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
উপসংহার: অধ্যাপক ইউনূসের সরকার গুম-খুন বন্ধ করা এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সাহসী ভূমিকা পালন করেছে। তবে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা বিঘ্নিত হওয়া এবং একটি বিশেষ শক্তির কাছে সরকারের ‘আত্মসমর্পণমূলক’ অবস্থান নিয়ে জনমনে প্রশ্ন রয়ে গেছে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ও গণভোটের মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে এই সরকারের সংস্কার উদ্যোগগুলো ভবিষ্যতে কতটা কার্যকর থাকবে। বর্তমানে দেশজুড়ে সবার নজর এখন চূড়ান্ত রাজনৈতিক উত্তরণের দিকে।
সুত্রঃ বিবিসি নিউজ বাংলা



