বিএনপির ভূমিধস বিজয়: দক্ষিণ এশিয়ায় ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত

✍️ প্রতিবেদক: দীপ্ত বাংলাদেশ নিউজ ডেস্ক

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) ও তার মিত্ররা বিশাল জয়লাভ করেছে। নির্বাচন কমিশন প্রকাশিত প্রাথমিক ফলাফলে দেখা গেছে, ২৯৯টি সংসদীয় আসনের মধ্যে বিএনপি জোট ২১২টি আসনে জয়ী হয়েছে। অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছে ৭৭টি আসন। বড় ব্যবধানে এই জয়ের মাধ্যমে প্রায় দুই দশক পর আবারও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ফিরছে বিএনপি। গত শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) ইসি আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচিত সদস্যদের গেজেট প্রকাশ করে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, প্রায় ১৭ বছর পর একটি সুষ্ঠু ও প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশে ক্ষমতার এই পরিবর্তন দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি ‘দৃষ্টান্তমূলক পরিবর্তন’ আনতে পারে। নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশের পরপরই প্রতিবেশী ভারত ও পাকিস্তানের সরকারপ্রধানসহ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানরা বিএনপির বর্তমান চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন মনে করেন, নতুন সরকার স্পষ্ট লক্ষ্য এবং কার্যকর বাস্তবায়ন কৌশলসহ একটি নতুন নীতি কাঠামো সামনে আনতে পারেবাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল

ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের পুনর্নির্মাণ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি জনাব তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানিয়ে সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করেছেন এবং ফোনে কথা বলেছেন। তিনি একটি গণতান্ত্রিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছেন। উল্লেখ্য যে, ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনা সরকারের সঙ্গে ভারতের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। তবে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেওয়ায় দুই দেশের সম্পর্কের টানাপোড়েন শুরু হয়। ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক আসিফ বিন আলী মনে করেন, বিএনপি সরকারের অধীনে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক হবে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে, যেখানে বাংলাদেশের নিজস্ব কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বজায় থাকবে। তবে তিস্তার পানিবণ্টন, সীমান্ত হত্যা এবং বাণিজ্য ঘাটতির মতো অমীমাংসিত ইস্যুগুলো নতুন সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।

পাকিস্তান ও চীনের প্রভাব যেখানে ভারতের সাথে সম্পর্কে কিছুটা অনিশ্চয়তা ও সতর্কতার অবকাশ রয়েছে, সেখানে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের গতি বৃদ্ধির সম্ভাবনা দেখছেন অনেক কূটনীতিক। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকেই দুই দেশের মধ্যে সরাসরি বিমান চলাচল এবং ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করার মাধ্যমে আস্থার পরিবেশ তৈরি হয়েছে। পাকিস্তানের প্রাক্তন পররাষ্ট্র সচিব সালমান বশির মনে করেন, প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত বিষয়ে বাংলাদেশ, পাকিস্তান এবং চীন আরও ঘনিষ্ঠ হতে পারে।

অন্যদিকে, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক আরও গভীর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। বেইজিং ইতিমধ্যেই বিএনপির এই বিজয়ে অভিনন্দন জানিয়ে সম্পর্কের নতুন অধ্যায় শুরুর প্রস্তুতির কথা জানিয়েছে। শেখ হাসিনা সরকারের আমল থেকেই চীন অবকাঠামো ও সামরিক খাতে বিনিয়োগ বাড়িয়েছে। বিশ্লেষক শাহাব এনাম খান মনে করেন, বিএনপি সরকার ইসলামাবাদ এবং দিল্লি উভয়ের প্রতি একটি ‘লেনদেনমূলক দৃষ্টিভঙ্গি’ অনুসরণ করবে, যা হবে বাস্তবসম্মত।

ঢাকার ভারসাম্য রক্ষার চ্যালেঞ্জ বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে ‘বাংলাদেশ প্রথম’ নীতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও জনগণের কল্যাণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। ভূ-রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি সার্বভৌম দেশ হিসেবে চীন, ভারত, পাকিস্তান ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার মধ্যে নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করে এগিয়ে যাওয়াই হবে আসন্ন বিএনপি সরকারের মূল কূটনৈতিক পরীক্ষা। আগামী দিনগুলোতে ঢাকা কীভাবে এই সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখে, সেদিকেই এখন তাকিয়ে আছে আন্তর্জাতিক মহল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *