ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যু কেবল একটি দেশের নেতার প্রস্থান নয়, বরং এটি মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এক প্রলয়ঙ্কারী মোড় হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। তেহরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় খামেনি নিহত হওয়ার পর ইরান যে প্রতিশোধের পথে হাঁটছে, তা বিশ্বকে এক সম্ভাব্য ‘তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের’ দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) সাফ জানিয়ে দিয়েছে, ‘প্রতিশোধের হাত’ থেকে খুনিরা রেহাই পাবে না। এর প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে ইরান ইতিমধ্যেই বিশ্বের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথ ‘হরমুজ প্রণালী’ বন্ধ করে দিয়েছে। প্রতিদিন প্রায় দুই কোটি ব্যারেল তেল এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়, যা বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। ইরানের এই পদক্ষেপকে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের সমতুল্য অর্থনৈতিক আঘাত হিসেবে দেখা হচ্ছে। এর ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম আকাশচুম্বী হওয়ার পাশাপাশি সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের ধস নামার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ইরানের পাল্টা হামলার জবাবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অত্যন্ত কঠোর ভাষা ব্যবহার করেছেন। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক পোস্টে হুমকি দিয়েছেন যে, ইরান যদি বড় কোনো আঘাত হানে, তবে যুক্তরাষ্ট্র এমন শক্তি প্রয়োগ করবে যা আগে কখনো দেখা যায়নি। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের এই অনড় অবস্থান, অন্যদিকে ইরানের মিত্র হিসেবে পরিচিত রাশিয়া, চীন ও তুর্কিয়ে যদি সরাসরি তেহরানের পাশে দাঁড়ায়, তবে কূটনৈতিক আলোচনার পথ রুদ্ধ হয়ে যাবে। ইতিহাসবিদদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি ১৯৮৯-৯০ সালের শীতল যুদ্ধ পরবর্তী পরিবর্তনের চেয়েও অনেক বেশি বিপজ্জনক।
এই যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে মধ্যপ্রাচ্যে কাজ করা লক্ষ লক্ষ বাংলাদেশি শ্রমিকের জীবন ও জীবিকা সংকটে পড়বে। রেমিট্যান্স প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি জ্বালানি তেল ও খাদ্যপণ্যের আকাশচুম্বী দাম বাংলাদেশের মতো দুর্বল অর্থনীতির দেশের ওপর সরাসরি আঘাত হানবে। ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে যে খাদ্য সংকট তৈরি হয়েছিল, মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধ তার চেয়েও কয়েকগুণ বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
শেষ পর্যন্ত জাতিসংঘ বা পরাক্রমশালী রাষ্ট্রগুলো আলোচনার টেবিলে ফিরতে না পারলে, খামেনির মৃত্যু কেবল একটি দেশের শোক নয়, বরং বিশ্বসভ্যতার জন্য এক দীর্ঘস্থায়ী বিভীষিকা হয়ে দাঁড়াতে পারে।



